কুমিল্লা প্রতিনিধি :
কালের বিবর্তনে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও এখনো স্বমহিমায় টিকে আছে কুমিল্লার ঐতিহাসিক পান বাজার। প্রতিদিনই এখানে বসে পানের বিশাল বেচাকেনার আসর। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিদিন কোটি টাকার পান কেনাবেচা হয় এই বাজারে। কুমিল্লা নগরীর রাজাগঞ্জ বাজারের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এ পান বাজারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পান নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। দূরদূরান্তের পাইকারি ক্রেতা ও বিক্রেতাদের পদচারণায় প্রতিদিনই মুখর থাকে বাজারটি।
পান বাজারের বৃহৎ আড়তগুলোতে গেলে চোখে পড়ে সারি সারি পানের স্তূপ। বড় বড় ঝুড়ি ও বস্তায় সাজানো বিভিন্ন জাতের পানের পসরা। এখানে জীবন, নরেন্দ্র, নারায়ণসহ বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে পান ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, পান বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে সামাজিক ও পারিবারিক নানা আয়োজনে পানের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা পান চাষের জন্য সুপরিচিত।
তাঁরা আরও জানান, একসময় কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর পানের বরজ দেখা গেলেও বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। তবে জেলার ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দলা, দেবিদ্বার, চান্দিনা ও বরুড়া এলাকায় এখনো পান চাষ অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পানের পাশাপাশি তাঁদের আড়তে বরিশাল অঞ্চলের পান বেশি আসে। মান ও চাহিদার কারণে বরিশালের পানের বেচাকেনাও তুলনামূলক বেশি।
বাজারের ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, বড় আকারের এক বিরা পান খুচরা পর্যায়ে প্রায় ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতি বিরা পান ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়। পানের বেচাকেনায় বিরা ও পুনের প্রচলিত হিসাব অনুসরণ করা হয়।
রাজাগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী নিতাই ও নরেন্দ্র জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পান বিক্রির পরিমাণ ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা কমে আসছে। একসময় এ পেশার সঙ্গে অনেক পরিবার জড়িত ছিল। এখন গুটিকয়েক ব্যবসায়ী বংশপরম্পরায় পাওয়া এ পেশা ধরে রেখেছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা ঐতিহ্যবাহী পান ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, পান বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। তবে আগের তুলনায় বর্তমানে পান চাষের বিস্তৃতি কমেছে। বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো অনেক পরিবার বংশপরম্পরায় পান চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, পান চাষিদের উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন ধরনের কৃষি উপকরণ ও সহায়তা প্রদান করছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পান চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া ও পরিবর্তিত বাজারব্যবস্থার মধ্যেও কুমিল্লার রাজাগঞ্জের ঐতিহাসিক পান বাজার এখনো তার স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। কয়েক প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় টিকে থাকা এ বাজার শুধু বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, কুমিল্লার ব্যবসা-বাণিজ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। ব্যবসায়ীরা আরো জানান এই হাট কাক ডাকা ভোর বেলা বসে এখানে ৫০ লাখ টাকা থেকে কোটি টাকার পান বিক্রি হয়।
![]()

